শুধু তাই নয়, এর কয়েক দিন আগে, ৮ অক্টোবর আয়ুঙ্গিন শোল এলাকায় ফিলিপাইনের একটি চিকিৎসা ও উদ্ধার মিশনে জলকামান ব্যবহার করে চীনা কোস্টগার্ড। ওই মিশনের লক্ষ্য ছিল বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজ থেকে এক ফিলিপিনো সেনাকে সরিয়ে নেওয়া।
এছাড়াও চীনের নিকটবর্তী মিসচিফ রিফে (স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি বিতর্কিত ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবাল প্রাচীর) সামরিকীকরণের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজটি আয়ুঙ্গিন শোল বা দ্বিতীয় টমাস শোলে (প্রবাল প্রাচীর) স্থাপন করেছিল।অচল অস্থায়ী সমঝোতা
উত্তেজনা কমাতে এবং ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে ২০২৪ সালে চীন ও ফিলিপাইন একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছায়। তবে এরপরও ২৫ সেপ্টেম্বর বিআরপি সিয়েরা মাদ্রেতে সেনা পরিবর্তন ও রসদ সরবরাহের মিশনে চীনের কোস্টগার্ড এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি বাধা দিয়েছে বলে জানায় ফিলিপাইন।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপিনো জেলেদের কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পথে চীনের কোস্টগার্ডের একটি জাহাজের ধাক্কায় ফিশিং সাপোর্ট ভেসেল বা নৌযান ‘বিআরপি দাতু মাগাত সালামাত’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ফিলিপাইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত এক মাসে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের সামরিক ও কোস্টগার্ড জাহাজের উপস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফিলিপাইন জানায়, পাক-আসা দ্বীপ, আয়ুঙ্গিন শোল, এসকোদা শোল এবং চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্কারবরো শোলের আশপাশে চীনের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ১০১টি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ৫৬।
চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন কৌশল : কতটা কার্যকর?
সমুদ্রে অনুপ্রবেশ ও চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি পশ্চিম ফিলিপাইন সাগর নিয়ে চীনের তথ্য প্রচারও ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চীনের তথ্য প্রচারের মধ্যে ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা, ফিলিপাইনের স্বাধীনতাকে খাটো করে দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার বিষয় রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির প্রভাবশালী মহলে প্রভাব বিস্তার করে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির পথও তৈরি হতে পারে।
সিঙ্গাপুরে সাম্প্রতিক ফোর্বস গ্লোবাল সিইও সম্মেলনে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা সামাল দেওয়া এবং সংঘাতের বিস্তার এড়ানোর বাস্তবতা মেনে নিয়েছে তার দেশ। তবে এই অবস্থানকে চীনের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং ফিলিপাইন নীরব কূটনীতির পরিবর্তে সামুদ্রিক এলাকায় চীনের কর্মকাণ্ডের ছবি, ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশের নীতি গ্রহণ করেছে। এর উদ্দেশ্য জনসচেতনতা বাড়ানো, অপতথ্য মোকাবিলা এবং ২০১৬ সালের সালিশি রায় বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করা।তবে এ কৌশল একা চীনের আচরণ পরিবর্তন করতে পারছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফিলিপাইনকে আরও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিরক্ষা বলয় ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ
প্রতিরক্ষা কৌশলের ক্ষেত্রে মার্কোস জুনিয়র সরকারের কমপ্রিহেনসিভ আর্কিপেলাজিক ডিফেন্স কনসেপ্ট বা সমন্বিত দ্বীপপুঞ্জ প্রতিরক্ষা ধারণা সামরিক ঘাঁটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া, দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানোর ভিত্তি তৈরি করেছে। চীনের প্রবেশ-প্রতিরোধ ও এলাকা-নিয়ন্ত্রণ কৌশলের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এ ধারণা বিবেচিত হতে পারে।
তাই ফিলিপাইনের উচিত বিদেশি সামরিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা গভীর করা এবং ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ, অস্ত্র মোতায়েন ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সামরিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে চীনের তথ্যপ্রভাব মোকাবিলায় শুধু ঘটনা প্রকাশ করলেই চলবে না। জাতীয় স্বার্থ, অভিন্ন মূল্যবোধ ও কোন সীমা অতিক্রম করা যাবে না—এসব বিষয়ে বক্তব্য ও পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে।
ফিলিপাইনের অধিকাংশ মানুষ খবর ও তথ্যের জন্য ফেসবুকের ওপর নির্ভর করায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মিত্র দেশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রসমর্থিত বা তাদের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমের ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হবে।
সম্ভাবনার সুযোগ
এছাড়া ২০২৬ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সভাপতিত্বের দায়িত্ব কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার সুযোগ রয়েছে ফিলিপাইনের সামনে। মিয়ানমার সংকট, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত বিরোধ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা মোকাবিলায় আসিয়ান কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠার সময় আসিয়ানের ঐকমত্য ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি যে বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। তাই আঞ্চলিক নীতিমালা হালনাগাদ এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ ফিলিপাইনের রয়েছে।
পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের তৎপরতা মোকাবিলায় তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যকর প্রতিরোধ, সমন্বিত কৌশল, প্রযুক্তি খাতে জবাবদিহি এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন—এমনটাই অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।


















