ডিজিটাল যুগে একটি দেশের সাইবার পরিসর নিরাপদ রাখা জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। হ্যাকিং, আর্থিক জালিয়াতি, তথ্য চুরি, ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তার নামে তৈরি আইন যদি অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত ক্ষমতানির্ভর হয়, তাহলে তা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
তাই প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনকে শুধু পুরোনো আইনের নাম পরিবর্তন বা সামান্য সংশোধন হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন একটি নতুন, প্রযুক্তিবান্ধব, স্পষ্ট ও মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত আইনি কাঠামো।
আমাদের অতীত আইনগুলোর অন্যতম দুর্বলতা ছিল সাইবার অপরাধ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মতপ্রকাশকে একই কাঠামোয় দেখা। অথচ র্যানসমওয়্যার হামলা, সার্ভার হ্যাক, ম্যালওয়্যার ছড়ানো কিংবা ফিশিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ স্পষ্টতই সাইবার অপরাধ। অন্যদিকে সরকারের সমালোচনা, ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা কোনো অনিয়ম প্রকাশ করা নিজেই সাইবার অপরাধ হতে পারে না।
নতুন আইনে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ অস্পষ্ট উসকানি কিংবা এ ধরনের ব্যাখ্যানির্ভর শব্দ ব্যবহারে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ অপরাধের সংজ্ঞা যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে তার প্রয়োগও সহজেই নির্বিচার হতে পারে। আইনের প্রতিটি অপরাধের সংজ্ঞা হতে হবে সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য এবং আদালতে পরীক্ষাযোগ্য।
স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারও নতুন আইনে যথাযথভাবে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। সাংবাদিকেরা যদি ডিজিটাল আইনে মামলার আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন, তাহলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরার জায়গা সংকুচিত হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল বা স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
তবে এই সুরক্ষা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন সাধারণ মানুষেরও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একজন নাগরিক, শিক্ষার্থী বা অধিকারকর্মীর আইনসম্মত ফেসবুক পোস্ট, ব্লগ বা অনলাইন মতামতও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ। সাংবাদিকদের জন্য এক ধরনের সুরক্ষা রেখে সাধারণ নাগরিককে ডিজিটাল হয়রানির ঝুঁকিতে রাখা হলে আইনের ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস দরকার। প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক, তথ্য ও ডিভাইসের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ এবং অনলাইনে প্রকাশিত কনটেন্ট এই দুই বিষয়কে এক করে দেখলে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনের প্রয়োগের আগে ক্ষতির মাত্রা, উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমারেখা থাকা দরকার। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, ডিভাইস জব্দ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অনুসন্ধানের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে বিচারিক তদারকি জরুরি। ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের সময় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন আপিল বা পর্যালোচনা কাঠামোও গড়ে তোলা যেতে পারে। অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা মতপ্রকাশসংক্রান্ত অভিযোগের প্রাথমিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক মামলার চাপ কমানো সম্ভব হবে।
অবশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা নয়। শিশু পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি কিংবা সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে এমন কোনো আইন করা যাবে না, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকেই সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রস্তাবিত আইন চূড়ান্ত করার আগে সরকার, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। একটি কার্যকর সাইবার আইন শুধু প্রযুক্তিকে সুরক্ষিত করবে না, একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাইবার আইন নাগরিকের জন্য ঢাল হবে, খড়গ নয়। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ, যেখানে প্রযুক্তি হবে নিরাপদ, রাষ্ট্র থাকবে সুরক্ষিত এবং নাগরিকের স্বাধীনতাও থাকবে সমানভাবে সুরক্ষিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়, আমরা প্রযুক্তিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করছি, আর প্রযুক্তিই বা আমাদের কতটা নিয়ন্ত্রণ করছে? ডিজিটাল ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই।


















