মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকেরা। তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বিকল্প জোগান দেওয়া এবং বছরে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রকল্পটির প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে গবেষকদের এ আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা বিষয়টি জানিয়েছেন।
প্রদর্শনীতে কুয়েটের অধ্যাপক ও প্রকল্পের গবেষক ড. মো. খালেকুজ্জামান মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি, গবেষণার অগ্রগতি ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন।
১০ বছরের গবেষণায় মিলেছে সাফল্য
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে চলা এ গবেষণায় ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় বর্জ্য থেকে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত হবে ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য
গবেষণাগারের সাফল্যকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দিতে পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্ল্যান্টে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
গবেষকদের হিসাবে, পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন ও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
বছরে সাশ্রয় হতে পারে ১৩ হাজার কোটি টাকা
গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব বলছে, প্রযুক্তিটি বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বিকল্প জোগান দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এর ফলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পাইলট প্ল্যান্টে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন খরচ, জ্বালানির গুণগত মান এবং অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হওয়ার সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। গবেষণাগারে পাওয়া ফলাফল বাণিজ্যিক পর্যায়েও একইভাবে অর্জন করা যায় কি না, তা নির্ধারণ করাও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা
গবেষকদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তায় প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশীয় জ্বালানি শিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে এ উদ্যোগ।
প্রকল্পটির প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।










