দাবানলের ধোঁয়ায় বিষাক্ত হয়ে উঠেছে ইন্দোনেশিয়ার বাতাস। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশজুড়ে কয়েক মাস ধরে চলা আগুনের প্রভাবে শুধু গত সেপ্টেম্বরেই আনুমানিক ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দাবানল ছাড়াও শিল্পকারখানা, যানবাহন ও বর্জ্য পোড়ানোর দূষণ যোগ করে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১০ জনে। একই সময়ে অস্বাস্থ্যকর দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে হয়েছে দেশটির সাড়ে ৫ কোটিরও বেশি মানুষকে।
সংবাদমাধ্যমটি আরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। হেলসিংকিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৫ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সিআরইএ বলেছে, ইন্দোনেশিয়ায় বন ও ভূমিতে আগুনের কারণে বায়ুর মানের অবনতি হয়েছে। এতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৬০। আগস্টের হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ।
সিআরইএর এই গবেষণায় কয়েক দিনের মধ্যে পিএম ২.৫ দূষণের কারণে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। পিএম ২.৫ হলো বাতাসের অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, যা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুস এমনকি রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এসব কণার সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দাবানলের ধোঁয়ায় সৃষ্ট বায়ুদূষণে আনুমানিক মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটেছে বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশীয় অংশ, জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপ এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলে।
গবেষকেরা দাবানল ছাড়াও নগরাঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে সৃষ্ট দূষণের প্রভাব পর্যালোচনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে এসব উৎসের দূষণে আরও ১ হাজার ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৯ কোটি মানুষের দেশটিতে ওই মাসে বায়ুদূষণে মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১০ জনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় পিএম ২.৫-এর সংস্পর্শে আসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্ধারিত সীমার চেয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাত গুণেরও বেশি ছিল। সুমাত্রায় এই মাত্রা ছিল ১০ গুণ এবং বোর্নিওর কালিমান্তানে উদ্বেগজনকভাবে ২৪ গুণ বেশি।
এ ছাড়া দেশজুড়ে শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণের ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বলছে, এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ক্রমেই আরও তীব্র হয়ে ওঠা খরার মধ্যে কয়েক মাস ধরে দাবানলের সঙ্গে লড়াই করছে ইন্দোনেশিয়া। বন উজাড়ের ওপর নজরদারি করা সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরের ৯ মাসে দেশটিতে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি দাবানলে পুড়ে গেছে।
তবে মৃত্যুর এই সংখ্যা নিয়ে ইন্দোনেশিয়া সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি বা প্রত্যাখ্যানও করেনি। দাবানলের ধোঁয়ায় সৃষ্ট ধোঁয়াশার কারণে ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুরেও বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি পরিষ্কারের জন্য গাছপালা কেটে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পদ্ধতিই এসব দাবানলের অন্যতম প্রধান কারণ। কাঠ, পাম তেল ও খনি খাতের অনেক কোম্পানি এ পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ জাভায় অবস্থিত রাজধানী জাকার্তাও বায়ুদূষণের শিকার। সিআরইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে জাভায় বায়ুদূষণে ১ হাজার ৫৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ থেকে ৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী দাবানলবহির্ভূত দূষণের উৎস—যেমন শিল্পকারখানা, যানবাহনের ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানো।
প্রতিবেদনে ইন্দোনেশিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডস্কেপ ইন্দোনেশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আগুস সারি সরকারের দুর্বল প্রস্তুতির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই দুর্যোগ ‘আগেই অনুমান করা সম্ভব এবং প্রতিরোধযোগ্য’ ছিল।
তিনি বলেন, বাজেট কমিয়ে দেয়ার কারণে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগুস সারি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার যা ঘটতে যাচ্ছে, তার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সক্ষমতা থাকা উচিত। কিন্তু আমরা একেবারেই প্রস্তুত নই। এর একমাত্র কারণ সদিচ্ছার অভাব।’
সিআরইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাবানল মোকাবিলায় আগুন নেভানোর তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি আগুনের ঝুঁকিতে থাকা পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধারের দিকে সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। ব্যাপকভাবে পানি নিষ্কাশনের কারণে এসব পিটল্যান্ড এখন আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগুন দিয়ে অবৈধভাবে জমি পরিষ্কারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতি ঠেকাতে জমি ব্যবহারের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি জবাবদিহিও বাড়াতে হবে।
জাভার মতো যেসব অঞ্চলে দাবানল ছাড়াই বায়ুদূষণ হচ্ছে, সেখানে আরও কঠোর নীতিমালা কার্যকর করার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।
তবে গত বুধবার ইন্দোনেশিয়া সরকার দাবানল মোকাবিলায় তাদের নেয়া পদক্ষেপের পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরেছে। এক বিবৃতিতে সরকার জানিয়েছে, কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো ও আগুন নেভানোর কাজে ৭২ হাজারের বেশি মানুষকে নামানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ২ হাজার ১০০ জনেরও বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে কাজে লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া বিতরণ করা হয়েছে ৫৩ লাখ মাস্কও।


















