নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার গোপালপুর মডেল কলেজ। একসময় এলাকার উচ্চশিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আজ নানা সংকটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। ২০০১ সালে শিক্ষানুরাগী রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও এখনো সরকারি আর্থিক সহায়তা পায়নি।শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস, আর্থিক সংকট এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে যে প্রতিষ্ঠান একসময় এলাকার শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও রাষ্ট্রচিন্তকরোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিজস্ব উদ্যোগে গোপালপুর মডেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমতি লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে কলেজটি একাডেমিক স্বীকৃতি অর্জন করে। প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং আর্থিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে যারা উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছিল, তাদের শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসা।
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন প্রতিষ্ঠাতা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যয় বহন করে আসছেন। শুধু তাই নয়, এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ও বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমেও সহযোগিতা করেছেন তিনি।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। তবে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগত অর্থায়নে একটি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার প্রচেষ্টা একজন মানুষের শিক্ষানুরাগ, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতারই পরিচয় বহন করে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একক ব্যক্তির পক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানের সব আর্থিক দায়িত্ব বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের সেই উদ্যোগ এখন নানা সীমাবদ্ধতার মুখে।
কলেজ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান বিএনপির সমর্থক হওয়ায় তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছ থেকে কলেজটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সরকারি সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর স্বার্থ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তাই বিবেচ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন সচেতন মহল। কারণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রভাব যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত গোপালপুর মডেল কলেজ কোনো সরকারি আর্থিক অনুদান পায়নি। দীর্ঘদিন ব্যক্তিগত অর্থায়ন চলতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আর্থিক সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। একটি কলেজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত আর্থিক সংস্থান, যোগ্য শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ঘাটতি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় গোপালপুর মডেল কলেজের সংকট নিরসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সুদৃষ্টি কামনা করে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও রাষ্ট্রচিন্তক রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান মনে করেন সংসদ সদস্য কলেজটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমস্যা এবং আর্থিক সংকট সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিবেন। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রত্যাশা করেন। সরকারি বিধিবিধান ও প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কলেজটির বর্তমান স্বীকৃতি, পাঠদানের অনুমতি, আর্থিক সহায়তা এবং এমপিওভুক্তির যোগ্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি বিধিবিধান ও প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কলেজটির বর্তমান স্বীকৃতি, পাঠদানের অনুমতি, আর্থিক সহায়তা এবং এমপিওভুক্তির যোগ্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষানুরাগী, বিত্তবান ব্যক্তি, সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও প্রতিষ্ঠানটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু কয়েকটি ভবন কিংবা শ্রেণিকক্ষের সমষ্টি নয়; এটি একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে আশপাশের দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই এমন একটি প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে তা কেবল প্রতিষ্ঠাতা বা পরিচালনা কমিটির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
গোপালপুর মডেল কলেজের দীর্ঘদিনের অবদান ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
একজন মানুষের স্বপ্ন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা গোপালপুর মডেল কলেজ যেন হারিয়ে না যায় এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিকতা এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কলেজটি আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
শিক্ষার আলো ছড়ানোর যে স্বপ্ন নিয়ে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্নের মৃত্যু তাঁরা দেখতে চান না। বরং গোপালপুর মডেল কলেজ আবারও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হবে, নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করবে এমন প্রত্যাশা এখন এলাকাবাসীর।


















