উপহাসের জবাব জিপিএ-৫, ১৪ বছর পর পড়াশোনায় ফিরেই সাফল্য রীতির
-
অনলাইন ডেস্ক
- আপডেট সময় : ০৫:৪২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিবেশীরা আমাকে দেখে হাসত, উপহাস করত। বলত, এই বয়সে আবার কলেজে ভর্তি হয়েছে! টাকা নষ্ট করে লাভ কী? আমি শুধু শুনতাম। মনে মনে ভাবতাম, আজ যারা আমাকে নিয়ে উপহাস করছে, কাল যেন তারাই আমাকে নিয়ে প্রশংসা করে। সেই চিন্তা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। গভীর রাতেও মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে, কখনো লাইট জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার এই পথচলায় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার স্বামী।
কথাগুলো বলছিলেন ৩০ বছর বয়সী রীতি খাতুন। সংসার, সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্ব সামলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পড়াশোনায় ফিরেছিলেন তিনি। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলও পেয়েছেন। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি।
রীতি খাতুন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের আব্দুল আলিম মন্ডল বাবুর স্ত্রী। তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিএম শাখা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন।
রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর সংসারজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে তাঁর ১১ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালনের মধ্যেই একসময় আবার পড়াশোনা শুরুর স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০২৪ সালে, এসএসসি পাসের প্রায় ১৪ বছর পর, কলেজে ভর্তি হন তিনি।
তবে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার পথটা সহজ ছিল না। সংসারের কাজ সামলে পড়াশোনার জন্য সময় বের করতে হয়েছে তাঁকে। প্রতিবেশীদের উপহাসও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেসব কথায় দমে যাননি। বরং ভালো ফল করার প্রত্যয় নিয়ে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়েছেন। তাঁর এই পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা ছিল স্বামীর। পাশাপাশি শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
রীতি খাতুন বলেন, আমার স্বামীর সহযোগিতা ছিল বলেই এই বয়সে এসে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর অনুপ্রেরণা আমাকে অনেক সাহস জুগিয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের কাজও সামলাতে হয়েছে। আমার এই ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদেরও অনেক সহযোগিতা ও সমর্থন রয়েছে। সবার সহযোগিতায় আজ ভালো ফল করেছি। আগামীতে যেন আরও ভালো কিছু করতে পারি, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
রীতির স্বামী আব্দুল আলিম মন্ডল বাবু বলেন, স্ত্রীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁকে কলেজে ভর্তি করাই। সংসারের কাজের পাশাপাশি সে অনেক সময় দিয়ে পড়াশোনা করেছে। তার এমন ফলাফলে পরিবারের সবাই খুব খুশি। আমরা আনন্দিত ও গর্বিত।
রীতির শ্বশুর সাইদুর রহমান বলেন, আমার ছেলের বউয়ের এমন ফলাফলে আমরা পরিবারের সবাই অনেক খুশি। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে যে ভালো ফল করেছে, তা আমাদের জন্য আনন্দের।
গ্রামের প্রতিবেশী আবু নাছের মন্ডল বলেন, আমাদের গ্রামের বউ রীতি খাতুন দীর্ঘ ১৪-১৫ বছর পর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাঁর এমন সাফল্যে গ্রামের সবাই আনন্দিত। আমরা চাই, এই আনন্দ সবাই মিলে উদ্যাপন করতে। প্রয়োজনে চাঁদা তুলে খাসি জবাই করে খাওয়াদাওয়া করব।
ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সায়ফুল ইসলাম বলেন, রীতি খাতুনের এই অর্জন প্রশংসনীয়। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে তিনি যে ফলাফল করেছেন, তা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার। তাঁর অধ্যবসায় ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
জনপ্রিয়

















