পাহাড়ে কারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও অস্ত্র সরবরাহ করছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট কোন ধারনা নাই। আর এই ধানা স্পষ্ট করা সরকারেরই দায়িত্ব। হঠাৎ করেই মাঝে মাঝে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে তোলার চেষ্টা করা হয়। দেশের মানুষের কাছে পাহাড়ে এ অশান্তির নেপথ্যে কারণ কিন্তু স্পষ্ট নয়। পাহাড়ে কারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং ষড়যন্ত্র করছে—এসব বিষয় জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে সরকারকেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বিগত চার দশক ধরে বিপুল সংখ্যা বাংলাদেশি (সমতলের মানুষ) পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে বসবাস করছে। পাবর্ত্য শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং শান্তিশৃংখলা বজায় রয়েছে। এমনকি পতিত সরকারের শাসনামলের ১৫ বছর পাহাড়ে কোনো শান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে দেখা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, ২৪ এর গণআন্দোলননের পর অর্ন্তবর্তী কালিন সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলে কেন এখন পাহাড়ে অশান্তির চেষ্টা করা হচ্ছে? কারা করছে এই চেষ্টা ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠী ছাত্রদের একটি গ্রুপ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখেছেন। এই ঔদ্ধত্যের নেপথ্যে কোন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তা কি শেষ হয়ে গেছে?
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। পাঁচ দফা দাবি আদায়ে গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় এ কর্মসূচি পালন করছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল। নিরাপত্তার কারণে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পর্যটকদের যাতায়াত ও পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। সাজেকের সংকট নিরসনে গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অবরোধকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্যে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানান, পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। বাকি দাবিটি নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। মূল দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন অবরোধকারীরা। ফলে বৈঠকের পরও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান আসেনি। অবরোধের কারণে পর্যটন, পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় জনজীবনে তৈরি হওয়া সংকটও কাটেনি।
একসময় পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত পাহাড়ের সাজেক। রিসোর্ট-কটেজে ছিল অতিথির ভিড়, রেস্তোরাঁয় চলত খাবার পরিবেশনের ব্যস্ততা, আর পর্যটনকে ঘিরে সচল ছিল শত শত মানুষের জীবিকা। সেই সাজেকে এখন নেমেছে নীরবতা। রিসোর্ট-কটেজে নেই অতিথি, রেস্তোরাঁয় নেই চেনা ব্যস্ততা, দোকানেও কমছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ। পর্যটকের অনুপস্থিতিতে বন্ধ হয়ে গেছে বহু মানুষের আয়-রোজগার। এরই মধ্যে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা দুর্ঘটনায় আহত হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে পারেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। দ্রুত এই সমস্যা সমাধারন না হলে আরো বেমী সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
অবরোধের কারণে পর্যটন, পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় জনজীবনে তৈরি হওয়া সংকটও কাটেনি। এ অবস্থায় অবরোধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমাধানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছাতে মানবিক বিবেচনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে সব থেকে আতঙ্কের বিষয় হলো রাঙামাটির সাজেকে আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে কেন্দ্র করে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন সাজেক ছাড়িয়ে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ জনপদকে স্থবির করে দিয়েছে। টানা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধে পরিবহন চলাচল বন্ধ, দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না, পাহাড়ি জনপদে বিরাজ করছে থমথমে আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বললেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সংঘাতের মূল চরিত্র ছিল অভ্যন্তরীণ। রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সক্রিয় সশস্ত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় একটি অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে বাংলাদেশের সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত রাষ্ট্রবহির্ভূত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মুখোমুখি। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামলা, হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ সামনে এসেছে। মিয়ানমার ও ভারতের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্ত্র, মাদক ও সশস্ত্র ব্যক্তিদের চলাচলের ঝুঁকি থাকায় একটি অঞ্চলের নিরাপত্তাশূন্যতা দ্রুত অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া বৃহত্তর অঞ্চলের কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে কুকি-চিন-মিজো জনগোষ্ঠীকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ধর্মভিত্তিক ভূরাজনৈতিক ধারণাও প্রচারিত হচ্ছে। এসব ধারণার ব্যাপক জনসমর্থনের প্রমাণ না থাকলেও অস্থিতিশীল পরিবেশে সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা বাইরের শক্তি এগুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেতে পারে।
সীমান্ত সুরক্ষা ও সন্ত্রাস দমনকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখার পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সামরিক বা আইনশৃঙ্খলাভিত্তিক ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে সেনাবাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা পরস্পরের সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন, সম্পদ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক আস্থার বিষয়গুলোও জাতীয় কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
আদিবাসী-সেটলার শব্দচয়ন মোটেই যৌক্তিক না; ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞান কোনটাই এ ধরনের সম্পর্ক সমর্থন করে না। সকলকে বাংলাদেশী, পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, সাথে সাথে সকলকে নৃতাত্বিক জাতি হিসেবে মর্যাদা দেয়া উচিত। পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য ন্যায় কমিশন গঠন করার বিষয়টি সরকার ভেবে দেখতে পারে এবং একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ সংরক্ষণ করা, যার সাথে কোন আপস করা যাবে না। দ্রুততম সময়ে গঠিত ন্যায় কমিশন’ সকল পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী যে নিপিড়নের শিকার হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বা বেসামরিক ব্যক্তি বা সংস্থা দ্বারা, তার সত্য অনুসন্ধান ও উদঘাটন করবে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি ও অবাঙালি (পাহাড়ি) সকল মানুষের সমান নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয় বা জাতিগত অবস্থান বিবেচনা না করে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র সহিংসতা বন্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধী বাঙ্গালি-উপজাতি, হিন্দু-মুসলমান যেই হোক না কেন, তাঁকেই ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দেশের নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। সেটা যেন কোন অবস্থাতেই অগ্রাধিকারের বাইরে চলে না যায়, সেই ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
পাহাড়ে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় পূর্বের সরকার পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত হচ্ছে এর রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সকল পক্ষকে কমিউনিটি লেভেলে অংশগ্রহনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার যে নীতিগত প্রয়োজন আছে তা পুরণ করা। নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় তাদের প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রেখে একই সাথে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোন অবস্থায়ই কারো মানবাধিকার রক্ষার ঘাটতি না হয়। বিদেশী ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে যেমন সতর্ক থাকতে হবে তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানবিধকার নিশ্চিত করার মধ্যে দিয়ে, বিশ্বব্যাপি যেসকল গ্রহণযোগ্য কনভেনশন আছে, তার আলোকেই কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। ১৯৯৭ সালে যে শান্তিচুক্তি করা হয়েছে সেটা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বিভাজনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারার আমুল পরিবর্তন করাও সময়ের দাবী। এ বিষয়ে সরকারের উচিত হবে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করা। শান্তিচুক্তির সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা দূর করে সময়োপযোগী পুনর্মূল্যায়ন, সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমবণ্টন ও স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি, বাঙালি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহন করা উচিত। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা মানে শুধু গোলাগুলি বন্ধ করা নয়; বরং মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিশ্চিত করা। যে-ই অবৈধ অস্ত্র ধারণ করুক, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করুক কিংবা সশস্ত্র সহিংসতায় জড়িত থাকুক, তার পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের অধিকার ও মর্যাদাও সুরক্ষিত রাখতে হবে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানবাধিকার কিংবা জাতিগত পরিচয়ের দোহাই দিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যেন বেআইনি কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার বন্ধের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অপহরণ, সশস্ত্র আধিপত্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অধিকারসংক্রান্ত সংকট ও উন্নয়নবৈষম্যের সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে।
পাহাড়ি বাঙালি ও অবাঙালি- সব জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও উন্নয়ন বৈষম্যের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোরও সমাধান করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে মতভেদ থাকায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা খুজে বের করতে হবে। কারা গুলি চালিয়েছে, কারা সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে, কারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন করেছে এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছেন কি না, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পাহাড়ের নিরাপত্তা কেবল পাহাড়ে অবস্থানরত নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়। সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষ যদি নিজেদের নিরাপদ, সুরক্ষিত ও রাষ্ট্রের অংশীদার মনে করেন, তবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা টেকসই হবে। সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত—শুধু পাহাড়কে নিরাপদ রাখা নয়, পাহাড়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়কে নিরাপদ করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী, নৃগোষ্ঠী, সেটলার, সেটলার বাঙালি শব্দগুলো বাদ দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনে সবার মধ্যে সমবণ্টন করতে হবে। পাহাড়ে ভূমিহীনদের ভূমির ব্যবস্থা করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা কেন্দ্রীয় স্বপ্ন না দেখে সকল জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে। তাহলেই পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বা পশ্চিমারা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারবে না।
অনেকেই বলে থাকেন – পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চাই, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি চাই না, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম স্পেশাল প্লেস। কিন্তু, তারা ভুলে যায় এখানে সেনাবাহিনীর কারণেই সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা এখনো বজায় রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ১৯৮০ সাল অথবা ১৯৯০ সালের দিকে যে ব্যবস্থাপনা ছিল যে অর্ডারটা, এস্টাবলিস্ট করতে হবে। নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে তাদের বোঝাতে হবে। তাহলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো আর কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারবে না। পাহাড়ে কোনো সমস্যা হলে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা একপেশে বিবৃতি বা মন্তব্য করেন। তারা নিজেরা না বুঝে, না জেনে যে বিবৃতি দেওয়া শুরু করেন, তাতে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মনে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্ম দেয়। বুদ্ধিজীবীদের একপেশে বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে তাদের। শান্তি চুক্তির সবগুলো ধারা যদি কার্যকর হতো, তাহলে পাহাড়ের সমস্যা অনেক কমে যেতো। শান্তি চুক্তির এই ধারায় সমস্যা রয়েছে সাংবিধানিক সাংঘর্ষিকতাও রয়েছে। শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্বিবেচনা একান্তই প্রয়োজন। এটা পুনর্মূল্যায়ন না করা গেলে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
শান্তি প্রতিষ্ঠা পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন কোনো সমস্যা নয়, দীর্ঘদিনের সমস্যা। শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া সেই অংশটুকু বাংলাদেশের ভবিষ্যতে রাখা যাবে কি না রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে থাকে। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার, এটা স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, দেশের শত্রুদের চক্রান্ত, তারা করতেই থাকবে, ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু সেটা থেকে বাঁচার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, আমাদের জাতীয় ঐক্য। এই সব বিষয়ে দল-মত, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত হতে হবে। রাজনীতিবিদদের একত্রিত হতে হবে।
(লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক )

















