Advertisement

ভারতের বন্ডবাজারে ভয়াবহ পতন, বড় বিপদে ভারতীয় অর্থনীতি

ভারতের বন্ডবাজারে ভয়াবহ পতন, বড় বিপদে ভারতীয় অর্থনীতি

বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে ভারতের বন্ডবাজার। দেশটির সরকারি বন্ডবাজারে টানা ১০ সপ্তাহ ধরে দরপতন চলছে, যা গত তিন দশকের মধ্যে দীর্ঘতম পতনের ধারা। এর মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি বেঞ্চমার্ক বন্ডের ইল্ড বেড়ে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্ববাজারে সুদের হার বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার ভারতের বন্ডবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে দীর্ঘ এই পতন ভারতীয় অর্থনীতির জন্য কতটা উদ্বেগের, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের ১০ বছর মেয়াদি বেঞ্চমার্ক সরকারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে ৭ দশমিক ৪৭৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল ৭ দশমিক ৪৫৯৬ শতাংশ।

এর মধ্যে গত সপ্তাহে ইল্ড বেড়েছে ৯ বেসিস পয়েন্ট। আর এর আগের টানা ৯ সপ্তাহে বেড়েছিল ৬২ বেসিস পয়েন্ট। ১৯৯৮ সালের পর এত বড় উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ কুপন হারের ২০৩৬ সালে মেয়াদপূর্তির বেঞ্চমার্ক বন্ডের ইল্ড দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪৭৪০ শতাংশে। আগের কার্যদিবসে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৫৯৬ শতাংশ। মূলত বন্ডের ইল্ড ও দামের মধ্যে বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, বন্ডের ইল্ড বাড়লে সাধারণত এর দাম কমে যায়।

এদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৫ ডলারে অবস্থান করছে। প্রায় ছয় মাসের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ দাম।

এর আগে সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার জানিয়েছিল, বিশ্ববাজারে সুদের হার বাড়তে থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের সরকারি বন্ড থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের পাশাপাশি কাছাকাছি হারে মুনাফা পাওয়ার আশায় তারা উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর বাজারে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।

ভারত ও উন্নত দেশগুলোর সুদের হারের ব্যবধান কমে যাওয়ায় ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগের আকর্ষণও কমেছে। সংবাদমাধ্যম বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতের ৯৮৭ কোটি রুপির সরকারি বন্ড বিক্রি করেছেন।

প্রসঙ্গত, কোনো দেশের সরকারি বন্ডবাজারে টানা দরপতন চললে তার প্রভাব শুধু আর্থিক বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারি বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়ে যায়। এর অর্থ, সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বা পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতে তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে হতে পারে।

এতে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে গেলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেয়ার খরচ বাড়তে পারে।

এর প্রভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ঋণের সুদও বেড়ে যেতে পারে, কমতে পারে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি। তবে এই প্রভাব কতটা তীব্র হবে, তা নির্ভর করে সরকারের ঋণের পরিমাণ, ঋণের মেয়াদ, সুদের হার নির্ধারণের ধরন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার ওপর।

এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে বন্ডবাজারে অস্থিরতা চললে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তারা সরকারি বন্ড থেকে অর্থ তুলে নিলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে এবং স্থানীয় মুদ্রার দর দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। মুদ্রার দর কমে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে।

আবার সরকারকে ঋণের সুদ বাবদ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে, যা সামাল দিতে নতুন ঋণ নেয়া বা ব্যয় কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে সরকারি বন্ডের দাম কমলেই যে অর্থনীতি সংকটে পড়বে, তা নয়।

অনেক সময় মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি কিংবা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বন্ডের ইল্ড বাড়ে। তাই বন্ডবাজারের পতন অর্থনীতির জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা বুঝতে সরকারি ঋণের ব্যয়, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।